বিপ্লবোত্তর যেমন শিক্ষক চাই!
আমরা প্রতিটি বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শ শিক্ষকদের দেখতে চাই। যাঁরা সত্যের জন্য লড়বে, শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তান মনে করবে, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে সবাইকে, যাঁরা হবেন দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী ও কর্মঠ।
শিক্ষক পিতৃতুল্য। অনেকের কাছে পিতার চেয়েও বড়। কারণ পিতা তাঁর সন্তানকে জন্ম দেয় শুধু, কিন্তু তাঁকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব একজন শিক্ষকের উপরেই বর্তায়। তবে এই শিক্ষক সমাজ-ই যদি আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীর উন্নতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তবে তার দায়ভার কার?
শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা, এতে সন্দেহ নেই! শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলে শিক্ষকবৃন্দ জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের কারিগর। তাঁরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক। তাঁদের অবদান ছাড়া একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও উন্নত দেশ কল্পনা করা যায় না। তাঁদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েই ছাত্রসমাজ দেশ সংস্থারের হাল ধরতে সক্ষম হয়।
দেশের সুনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষণ করার সুযোগ হয়েছে। শিক্ষকের হীন মনমানসিকতার দ্বারা শিক্ষার্থীর জীবন যেমন শেষ হয়েছে তেমনিভাবে শিক্ষকের ভালোবাসা পেয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু প্রশ্ন হলো শিক্ষকরা হীন মানসিকতা ধারণ কেন করছে ? কেন ভালোবাসা দিয়ে সবাইকে নিজের সন্তানের মতো আদর যত্ন করে গড়ে তুলছে না? এর প্রধান কারণ হলো শিক্ষকরা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে গত কয়েকদিন হলো একটা বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে। তা হলো জোড় করে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদত্যাগ! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? উত্তর সহজ এবং স্পষ্ট। কারণ হলো তাঁরা দায়িত্বে থাকাকালীন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি অথবা তাঁদের বেশিরভাগই ২৪ এর স্বৈরাচার পতনের আন্দলোনে বিরোধীতা করেছে বা নীরব ভূমিকা পালন করেছে। একজন শিক্ষকের কাছে যা আমাদের কারুর-ই কাম্য নয়।
শিক্ষক যদি রাজনৈতিকভাবে অন্ধ হয় তাহলে জাতির উন্নতি অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষক হবেন বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর আদর্শ। কিন্তু আমাদের সমাজে তার উল্টো চিত্র প্রতীয়মান হয় বলে অনেকে মনে করেন । কেউ আর শিক্ষককে তেমন সম্মান করে না গুটিকয়েক অমানবিক শিক্ষকের কারণে। কিছু শিক্ষক আছেন যাঁরা ন্যায়কে ন্যায় আর অন্যায়কে অন্যায় বলে পক্ষাবলম্বন বা বিরোধিতা করে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষকের দ্বারা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার । এক্ষেত্রে মেয়ে ভুক্তভোগীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ইদানীং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলো তার বাস্তব উদাহরণ। কতশত ঘটনা চাপা পড়ে যায় আত্মসম্মান হারানোর ভয়ে তার ইয়ত্তা নেই। অনেক প্রতিবাদী শিক্ষার্থীকে রেজাল্টের ভয় দেখিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায় কিছু শিক্ষক। এর চেয়ে জঘন্য অপরাধ আর কী হতে পারে! এটা জাতির জন্য লজ্জা।
আমরা ছাত্রসমাজ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে রাষ্ট্র সংস্থারের ডাক দিয়েছি। আমরা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ সকল ক্ষেত্রে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাই। আর এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন বৃথা যদি শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক সংস্থার করা না হয়। আমরা চাই শিক্ষকরা নিজেদের ভুলগুলো সংশোধন করে ক্লাসে ফিরুক। আমরা প্রতিটি বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শ শিক্ষকদের দেখতে চাই। যাঁরা সত্যের জন্য লড়বে, শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তান মনে করবে, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে সবাইকে, যাঁরা হবেন দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী ও কর্মঠ। যাঁরা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভালোভাবে জানবেন ও নিজের মধ্যে গভীরভাবে লালন করবেন। শিক্ষার্থীদের সচেতনভাবে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করার মাধ্যমে গড়ে তুলবেন সুনাগরিক। যাঁরা আমাদের সবার আদর্শ বলে বিবেচিত হবেন। আমরা এমন শিক্ষক চাই যাঁরা শিক্ষাগুরুর মর্যাদাকে উন্নত করবে। যদি তা না হয় তাহলে আমাদের কষ্টে অর্জিত এই স্বাধীনতা একসময় তার মূল্য হারাবে।
আমি বিশ্বাস রাখি প্রতিটি মানুষ সক্ষম, সৃজনশীল এবং অফুরন্ত শক্তির আধার। মানুষের এই সক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং অফুরন্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা আমাদের মূল লক্ষ্য। একটা সুন্দর সমাজ গড়তে শিক্ষকরা আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করবে এটাই আমাদের কামনা।
মোঃ আবদুল বারিক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।